আড্ডার সেই দিনগুলো

নস্টালজিয়া। লেখার শুরুতে এই শব্দটাই মনে এল। আমি কলকাতার বাইরে হল বহুদিন। কিন্তু কলকাতা শব্দটা মনে এলেই মন ভাল করা আর খারাপ করা, এই দুই অনুভূতি একসাথে হয়। ভাল করা এই কারনে যে একরাশ ভাললাগার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আর মন খারাপ করা কারন সেই ভাললাগাগুলোর পুনরাবৃত্তি সম্ভব না বলে। সব থেকে আনন্দে কাটিয়েছি বোধহয় কলেজ জীবনটা। বাঁধনহীন আনন্দ। গড়পড়তা বাঙ্গালী থেকে আমিও আলাদা নই। তাই একটা “আমি সব জানি” বোধ মনের মধ্যে প্রবল। তার সাথে যোগ হয়েছে কলেজে অনার্স নিয়ে পড়ার অহংবোধ। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বোধবুদ্ধিসম্পন্ন জ্ঞানবান ব্যক্তি। যার পলিটিক্স থেকে খেলা থেকে রান্না সবেতেই বুৎপত্তি ও বোধিপ্রাপ্ত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে আমার বাকি বন্ধুরাও সমমাত্রায় বা অধিক মাত্রায় জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে করতেন নিজেদের।

কিন্তু অন্য কেউ ভাবুক বা না ভাবুক, নিজেকে সবজান্তা ভাবার এক বড় সুবিধা আছে নিজের ও সমাজের জন্য। অনর্গল সর্ববিষয়ে কথা বলার লোকের অভাব হয় না। আড্ডায় বক্তার অভাব না থাকলে সোনায় সোহাগা। একটা জিনিসের জন্য আইনস্টাইনের কাছে সব মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তা হল রেলেটেভিটি কনসেপ্ট। স্পেস-টাইমের কেরামতি বোধগম্য না হলেও, শুধুমাত্র রেলেটেভিটি কনসেপ্টই যথেস্ট। আর সেই রেলেটেভিটি অনুযায়ী আমার বন্ধুদের তুলনায় আমার জ্ঞান অনেকটাই কম সর্বব্যাপী ছিল। তাই শ্রোতার ভূমিকা আমার আড্ডার ক্ষেত্রে বরাবর প্রিয়তর। আড্ডার বক্তা বা শ্রোতা থাকলে স্হান তো থাকবেই। সেই অঙ্ক মেনে আমাদের আড্ডার স্হান ছিল কলেজ স্ট্রীটের বিভূতি কেবিন। কফি হাউসে কালে কস্মিনে পা দিলেও তা আমাদের রোজকার আড্ডামন্দির হিসাবে পরিগনিত হত না।

আমরা বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তাম। সাত আট জনের একটা ক্লোসড গ্রুপ ছিল। রন্জনা, সজল, স্বাগতা, অশোক, ঊর্মিমালা, শঙ্খ আর আমি। আরও দু চারজন মাঝে মধ্যে এস যেত কোর গ্রুপের বাইরে থেকে। আপনারা সবাই নিশ্চয়ই কলেজ স্ট্রীট মার্কেট চেনেন। কলেজ স্ট্রীট বাটার উল্টোদিকের গেট দিয়ে ঢুকলে নাক বরাবর চলতে থাকবেন। রাস্তা শেষ হলে আট দশ পা চলবেন “বাঁয়ে মূড়” হয়ে। ব্যাস, আপনার ডানহাতেই বিভূতি কেবিন। দুপাশে দুটো সিঁড়ি। তিন ধাপ উঠলেই আপনি ঢুকে গেলেন আপনার গন্তব্যে। বাঁ হাতে তিনটে কাঠের খুপরি। একেবারে ডানদিকেও তাই। মাঝের জায়গাটুকুতে দুটো টেবিল। এই কাঠের খুপরিগুলোর দুখানাতে স্যুয়িং ডোর লাগানো একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারীদের জন্য। আর ঢোকার আগে সাইনবোর্ডে দেখতে পাবেন নানান খাবারের লিস্টি। তাতে লান্চ  থেকে স্ন্যাকস সব আছে। বিভূতি কেবিনে আমার কোনোদিন লান্চ বা ডিনার করবার সৌভাগ্য বা প্রয়োজন হয়নি। তাই কেবলমাত্র ফিশ ফ্রাই, কবিরাজী, মোগলাই পরোটা আর বাটার টোস্টের কথাই মনে আছে।

বন্ধুত্বের অলিখিত আইন মেনে প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা আমরা বিভূতি কেবিনে হাজিরা দিতাম। বেশিরভাগ সময় কলেজ থেকেই একসাথে আসা হত। ছুটি বা অন্যদিনগুলোতে যে যার নিজের মতো পৌঁছে যাওয়া। মোবাইল না থাকা কোনোদিন আমাদের যোগাযোগের অন্তরায় হত বলে মনে হয়না। একজন দুজন করে হাজির হতাম। শুরু হত গুলতানি। বিভূতি কেবিনের নির্মলদাকে মনে হয়না কোনোদিনই আমাদের কেউ ভুলতে পারব বলে। ওই আমাদের চা খাবার এনে দিত। খাবারের ভাগটা বেশির ভাগ সময় কম হত, চা টা বেশি। আমাদের সাথে নির্মলদাও টুকটাক আড্ডায় জুটে যেত। প্রায় আমাদেরই বয়সী। খুব হাসিখুশি। ওর জানাই ছিল আমরা কি খাব না খাব। তাই অর্ডার দেবার জন্য অযথা সময় নষ্ট করার দরকার হত না। আমাদের পড়াশুনার জায়গাও ছিল ওই বিভূতি কেবিন। কলকাতার ঐতিহ্য অনুযায়ী সবাই টিউশনে যেতাম। টিউশনের উদ্দেশ্য পড়া অথবা সময় নষ্ট করা ছিল, তা এই মূহূর্তে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারি না। আমি বোধকরি টিউশন থেকে কোনোদিন কিছু শিখিনি। তা ওই আড্ডাতেই আমার যা শেখা হয়েছিল। নোট শেয়ার করা থেকে ক্লাসের লেকচারের ভাবার্থ, সব কিছু বিভূতি কেবিনে। আমাদের আশ্পাশে আরও কিছু ভদ্রলোক বসতেন। তাঁরা বোধকরি কলেজে পড়াতেন। ভারি ভাল সহাবস্থান ছিল আমাদের। কেউ অন্য কাউকে বিরক্ত করতাম না। কিন্তু তাঁদেরও কেউ কোনোদিন অনুপস্হিত থাকলে আমাদের চোখে পড়ত।

আড্ডার এক বড় প্রাপ্তি অবশ্যই জেনারেল নলেজ বাড়ানো। রকমারি টপিক, বিশ্লেষন, ভবিষ্যতে কি হতে পারে- কি নেই সেই আড্ডায়। আর পৃথিবীর সব আড্ডাতেই বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের সমাবেশ হয়। আমাদেরটাও তার ব্যাতিক্রম ছিল না। জ্যাঠা, মাসী, গুলবাজ, দুঃখবিলাশী – সব হাজির। তাই বিভিন্ন রসের আলোচনা, বিভিন্ন ঢঙে তার পরিবেশনা। কখনো ফিশ ফ্রাই, কখনো বাটার টোস্ট, কখনো মোগলাই, কখনো ফ্রেন্চ টোস্ট, কখনো বা শুধুই চা দিয়ে সেই বাক্যরস কর্নকুহরে প্রবেশ করানো। সেখান থেকে ফিল্টার করে মরমে ঢোকানো। সত্যি বলতে কি বিভূতি কেবিনই আমাকে শিখিয়েছে যে মরমের মেমোরি কার্ডের একটা নির্দিষ্ট লিমিট আছে। সুতরাং ইনফরমেশন ফিল্টার করতে শেখা জীবনে জরুরী। নির্মলদার কাছে আমাদের সবার খবর থাকত। কে কবে আসবে না আসবে- সব। শেষবার বিভূতি কেবিনে সবার দেখা প্রায় সাত আট বছর আগে। এখনও যেন মনে হয় সেই দিনগুলো স্বপ্নের মতো ছিল। ম্যানিব্যাগে সামান্য পয়সা নিয়ে দিনের পর দিন অমন আড্ডা, ওই সঙ্গ, ওই অকারন হাসি চিৎকার অমূল্য।

আর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আর একটা নাম ভুলতে পারি না। বাদলদা- কলেজ স্ট্রিটের একটা ছোট্ট ঘুপচি বইয়ের দোকানের মালিক। বেশির ভাগ দিনই বিভূতি কেবিন থেকে বেরিয়ে আমরা দু-তিনজন বাদলদার দোকানে যেতাম নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে। একটা বই কেনার থাকলে অন্তত ঘন্টাখানেক আড্ডা বাদলদার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। যে বইটা কিনবে, তার মতামতের মূল্য সেদিন সবথেকে কম। বাকিরাই ঠিক করবে কি বই কেনা হবে। একটা বই কেনার জন্য শ’খানেক বই নামানো হবে। তাদের বিশ্লেষন হবে। বিশ্লেষনের ভূমিকা বাদলদার, টীকা টিপ্পনী আসবে বাকি সবার কাছ থেকে। বইয়ের মলাট থেকে কাগজের গুণমান, সব সেই টিপ্পনীর অন্তর্গত। অনেক আলোচনা ধ্বস্তাধ্বস্তি হবার পর একটা বই হয়তো পছন্দ হল সবার। আর বাদলদাও অতক্ষন সময় আমাদের সাথে কাটাত। আর মাঝে সবাইকে চা খাওয়ানো। ধীরে ধীরে বাদলদা আমাদের খুব কাছের বন্ধু হয়ে গেছিল। বাদলদার আর একটা গুন ছিল। খুব ভাল তবলা বাজাত। দিল্লিতে চলে আসার পরও যখনই কোলকাতায় গেছি, বাদলদার কাছে একবার করে ঢুঁ মারতাম। তিন-চার বছর আগে শুনলাম বাদলদা দোকান বিক্রি করে চলে গেছে।

আর একটা জায়গায় আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে “চাচাস্” বলে একটা ছোটো রেঁস্তোরাতে। মাঝে মধ্যে যেতাম আমরা সবাই মিলে। বাটার টোস্ট আর ফিশ ফ্রাই থেকে জিভের স্বাদ বদলাতে। চাচাস্ এ আমার বিশেষ প্রিয় খাবার ছিল গ্রেভি সমেত প্রন নুডলস আর ফিশ বা প্রনের কোনো সাইড ডিশ। বহুদিন ওখানে আর যাওয়া হয়নি। দেড় তলার উঠে চাচাস্ এর সেই খাবারের কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। জানি না আজকের কোলকাতাও একই আছে কিনা। আজকের দিনেও বন্ধুদের আড্ডাতে ছেলে মেয়েরা অমন নির্ভেজাল আনন্দ খুঁজে পায় কি না। হোয়াটস আ্যপ আর ফেসবুকের কল্যানে কতটুকু সময় মানুষের স্বর প্রাধান্য পায় আর কতক্ষন শুধু মোবাইলের টিং টিং আওয়াজ শোনা যায়। ছয় ইন্চি দূরে বসা বন্ধুর সাথেই কথা হয় নাকি বহুদূরে থাকা কোনো ভার্চুয়াল বন্ধুর টানে চোখ মোবাইলেই আটকে থাকে। কলেজের ছেলেমেয়েরা বিভূত কেবিনকে আড্ডাস্হল বানায় কি না ম্যাকডোনাল্ডস বা ক্যাফে কফি ডে বা কোস্টা কফি বা স্টার বাকসের ঝকমকে আবহ তাদের বেশি টানে। আর সব থেকে বড় হল এখনও বন্ধুরা সেই প্রানের টান অনুভব করে কি না একে অন্যের প্রতি। আমিও সময়ের সাথে সাথে অনেক বদলেছি। ভাল লাগা মন্দ লাগার পরিবর্তন হয়েছে অনেক। কিন্তু যে মূহূর্তে সেই দিনগুলো মনে আসে, ইচ্ছে করে কোনোভাবে যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম ওই দিনগুলোতে। সেই ঝকঝকে চোখের ছেলেমেয়েগুলোর কারনে অকারনে হাসি আর অনাবিল আড্ডার দিনগুলোতে। নস্টালজিয়া……….আর কোনো সঠিক শব্দ মনে পড়ছে না ওই দিনগুলো সম্পর্কে আমার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য।

Advertisements

6 thoughts on “আড্ডার সেই দিনগুলো

  1. নস্টালজিয়া …..
    সত্যি তাই, সেই কলেজ স্ট্রিট , সেই বই এর দোকান, কলেজ স্কোয়ার এর কোনে পাউরুটি দিয়ে স্টু, কফি হাউসের আড্ডা, হাঁসি, গান, গল্প, খুনসুটি , ভালোবাসা , সম্পর্কের ভাঙা গড়া….

    এক ধাক্কা তে আড়াই দশক আগে পৌঁছে গেলাম।

    অনেক শুভেচ্ছা বন্ধু 💝
    ~হিমাদ্রি ~

    Like

  2. Thank you so much for sharing your nostalgic feelings with us.. college street manei purono kolkatar gondho.. boi er dokan.. coffee house.. paramount er sarbat … College square er pool er dhare adda.. asadharon.. darun laglo..

    Like

  3. Nostalgia, a feeling of pleasure and also slight sadness when u think about, ……. Ai topic diye suru kore…. College jibon….. badhon hin aanondo…. Tari modhe aami sob jani ekta bhab….. College street er bibhuti cabin e aada….. Vidyasagar college er 7,8 joner group….. Sob kichu miliye ekta darun sundor oonubhuti.
    …. tokhun kar diner gyan prapti je kono choto restaura te bose hoto setao jante parlam….. 100 ta boi ghete ekta boi kena, mane 99 ta boi er kom besi gyan orjon Kora eta ashadharon.
    ……. Aajker din er chele mey r aada mar be khotha theke??? Somoy o to howa uchit.
    …… Nursery te pora sisu k aaj ker abhibhawok ra school theke aasa matro ei khela r mathey na pathiye forcefully extracurricular activities sekhanor chesta kore….. Tar pore school er homework, tutions blah blah blah….. Ei routine e boro hote thaka baccha socialize hote bhule jae…. Bhondhu der sathe aada mara kotha to bhabai jaye na…… Tar por class 12th er board exam jei shes hoy sei state er baire kono nami college e admission korano hoe…. Prochur taka r fees diye porano ebong student er hathe aunek ta Pocket money, songe dewa hoy dami mobile, laptop, ATM card, blah blah blah…..
    ….. Sohore konay konay MC Donald’s, Domino’s, CCD, inox, box office, shopping malls, ei sob chere kon student er dol jabe kono choto restaura e aada marte…
    …. Ek generation ei aunekta poriborton aise gache…. Ei poriborton er karon sothik Jana nei aamar….. Jodi tumi jano to pore r episode e janar iccha rohilo….
    ….. “Aloker ei jhorn dhara” tittle ta khubi sundor…… Tomar lekha jotoi pori totoi porte iccha kore….. Bhabuk hoye nijer kichu moth rakhlam….. Jodi kichu bhul likhechi to khoma prathi…..
    …… Aunek subhecha rohilo…

    Like

    1. Thank you so much Chaitali. Dekhe bhalo laglo je nijer bhabna share korle anyo keo bhabte sahajyo kora jay. darun. asha korbo sb lelhatei tomar motamot pabo.

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s